জালাল উদ্দিন ওমর:
সময়ের পরিক্রমায় বছর ঘুরে মুসলিম বিশ্বে আবারো পবিত্র মাহে রমজান সমাগত। ইতিমধ্যেই আমরা শাবান মাস অতিবাহিত করছি। শাবান মাস হচ্ছে রমজানের প্রস্তুতির মাস। শবে বরাতও পার হয়ে গেছে। আর কয়েকদিন পরেই রোজা শুরু হবে। চাদেঁর হিসাব অনুযায়ী আগামী ৭ই জুন থেকে রোজা শুরু হবে। তার মানে রমজান মুসলমানদের দরজায় কড়া নাড়ছে। রমজানের গুরুত্ব এবং তাৎপর্য সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলার প্রয়োজন নেই । মুলতপক্ষে যা কিছু ইসলামের শিক্ষা তাই রমজান আমাদেরকে ট্রেনিং দেয় । বৎসরের ১২ টি মাসের মধ্যে রমজান মাস আলাদা বৈশিষ্ট্য, মর্যাদা এবং গুরুত্ব বহন করে। এই রমজান মাস আল্লাহর পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য একটি বিশেষ উপহার। রহমত , বরকত আর মাগফেরাতের বার্তা নিয়ে রমজান মানবজাতির কাছে হাজির হয় । রমজান মাসে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে বান্দাহ আল্লাহর কাছে পাপ মার্জনার সুযোগ লাভ করে । রমজান মাসে মানবজাতি তাকওয়া অর্জন করে। রমজান মাসের ইবাদতের মুল্য আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বেশি । রোজাদারকে ইফতার করানোর মাঝে আল্লাহ বান্দার জন্য বিশেষ পুন্যের বরাদ্দ রেখেছেন। এই মাসে তারাবিহ পড়তে হয় , সেহেরি খেতে হয় । দিনের শেষে ইফতারির মাধ্যমে রোজা শেষ করতে হয় । মুলতপক্ষে রোজা হচ্ছে মানবজাতির ট্রেনিং এবং আত্মগঠনের মাস। এই মাস মন্দ কাজ চিরতরে পরিহার করে উত্তম চরিত্র গঠনের মাস। এই মাসে তাকওয়া অর্জন করে , বাকি ১১ মাস ভালভাবে চলার সুযোগ দেয়। রমজান মাসে আল্লাহ , তার প্রিয় রাসুল হযরত মুহাম্মদ (স) এর ওপর কোরান নাযিল করেছেন। এই কারনে রমজান মাস অনন্য বৈশিষ্ট্যের দাবিদার। আর কোরান হচ্ছে বান্দার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত সবর্শেষ এবং সবশ্রেষ্ট আসমানী কিতাব, যা মানবজাতির জন্য পথপদর্শক। এই মাসেই রয়েছে হাজার রাত্রির শ্রেষ্ট রাত্রি পবিত্র লাইলাতুল কদর। যে রাত্রির ইবাদাত আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় । সুতরাং রমজান মাস আসার সাথে সাথে মুসলিম সমাজে বিরাট এক পরিবর্তন আসে। মুসলমানদের চিন্তা চেতনা এবং কর্মে পরিবর্তন আসে। দৈনন্দিন কাজ কর্মের রুটিনে ও পরিবর্তন আসে। অফিস আদালতে নতুন সময়সুচি চালু হয়। মুসলিম সমাজের র্সবত্রই একটি পবিত্র ও ভাবগম্ভীর পরিবেশের সৃষ্টি হয় ।
প্রতি বছর রমজান আসে , আবার প্রকৃতির নিয়মেই মাস শেষে রমজান চলে যায় । আর মুসলমানরা বছরের পর বছর ধরে রমজান পালন করছে। কয়েক হাজার বছর ধরে এই নিয়ম চলে আসছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত এই ধারা চলবে । রমজান আমাদেরকে সংযম শিক্ষা দেয় , নৈতিকতা শিক্ষা দেয় , সততা শিক্ষা দেয় এবং সর্বোপরি মানব কল্যান শিক্ষা দেয় । রমজান সবসময় ধৈর্য্য ধারনের কথা বলেছে , মিথ্যাকে পরিহারের কথা বলেছে , সকল ধরনের পাপকে বর্জনের কথা বলেছে , অশ্লীলতা কে বর্জনের কথা বলেছে এবং অপরের ক্ষতি করা থেকে দুরে থাকার কথা বলেছে । রমজান আমাদেরকে মানুষকে ভালবাসার কথা বলেছে । লোভ , লালসা , হিংসা , বিদ্বেষ পরিহারের কথা বলেছে । বিপদে আপদে অপরের পাশে থাকার কথা বলেছে । অপরের দু:খ লাগবে নিজেকে উৎসর্গ করার কথা বলেছে । কিন্তু মুসলিম জাতির বড়ই দুর্ভাগ্য যে , রমজানের প্রকৃত শিক্ষায় মুসলমানেরা এখনো শিক্ষিত হতে পারেনি। তাই সংযমের মাস রমজানে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম আরো বেড়ে যায়। এক শ্রেনীর ব্যবসায়ী কিভাবে অত্যাধিক মুনাফা করবে, তার জন্য প্রতিযোগিতায় নামে। অথচ এটা ইসলামের শিক্ষা নয় , রমজানের ও শিক্ষা নয় । অপরদিকে সামর্থ্যবান মানুষেরা প্রায়ই পুরো রমজান এবং ইফতারির জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য দ্রব্য একসাথে কিনেন। ফলে অটোম্যাটিক্যালি বাজারে এসব পন্যের সংকট সৃষ্টি হয়, যা পুরোটাই কৃত্রিম । আর এই সুযোগে বেশি চাহিদাকে ইস্যূ বানিয়ে ব্যবসায়ীরা এসব পন্য সামগ্রীর দাম বাড়িয়ে দেয়। আবার ব্যবসায়ীরা অধিক মুনাফার আশায় পন্য মজুদ করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে এবং পন্যের দাম ইচ্ছামত বাড়িয়ে দেয়। ফলে যারা গরীব মানুষ এবং যারা দিনে আনে দিনে খায়, তারা সেহেরী এবং ইফতারীর জন্য ভালো এবং পুষ্ঠিকর খাবার কিনতে পারে না । ফলে তারা সেহেরীতে ও ভাল খাবার খেতে পারে না আবার ভাল কিছু দিয়ে ও ইফতারী করতে পারে না। ধনী লোকেরা যেখানে উদর পুর্তি করে সেহেরী এবং ইফতারী খায় , সেখানে মুসলিম সমাজেরই অনেক মানুষ কোন রকমে ডাল ভাত খেয়ে সেহেরী সারে আর পানি পান করে ইফতার করে । সুতরাং এই দৃষ্ঠিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনতে হবে। মনে রাখতে হবে অতিরিক্ত মুনাফার জন্য মজুদদারিতা এবং অতিরিক্ত বিলাসীতার জন্য লাগামহীন অর্থ ব্যয় কোনটাই ইসলামের শিক্ষা নয় । সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের উচিত একসাথে পুরো মাসের বাজার না করে কয়েক দিনের বাজার করা এবং গরীব লোকেরা যাতে ভাল কিছু খেয়ে সেহেরী এবং ইফতার করতে পারে সেই ব্যবস্থা করা। রমজান আসলেই ইফতার পার্টির হিড়িক পড়ে। বড় বড় হোটেলে , জাকজমক পূর্ন আয়োজনে , নানা ধরনের সুস্বাদু খাদ্য দিয়ে ইফতার পার্টির আয়োজন চলে। সমাজের অর্থশালী, বিত্তশালী এবং সামর্থবান লোকেরাই এতে অংশগ্রহন করে। কিন্তু এতিম, মিসকিন, গরীব এবং সমাজের অসহায় ও বঞ্চিত মানুষদের জন্য এরকম ইফতার পার্টির আয়োজন তেমন একটা হয় না। অথচ করতে হবে তাদের জন্য আর এটাই রমজানের শিক্ষা । মাসব্যাপী সিয়াম সাধনার শেষে মহান আল্লাহ তার সিয়াম সাধনাকারী মুসলমানদের জন্য খুশীর উৎসব হিসাবে ঈদুল ফিতরের ব্যবস্থা করেছেন। এদিন মন খুলে কোলাকুলি করার দিন। এদিন ধনী গরীব সকল মানুষের ঘরে ঘরে আনন্দ এবং খুশীর উৎসব চলাটাই স্বাভাবিক বিষয় । কিন্তু দুর্ভাগ্য , সবার ঘরে এবং সবার মাঝে ঈদের আনন্দ থাকে না। কারন সেদিন অভাবের কারনে অনেক পরিবারের লোকজন নিজেরা ও নতুন জামা কিনতে পারে না আবার ছোট ছোট ছেলেমেয়েদেরকে ও নতুন জামা কিনে দিতে পারে না । আবার অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য সেমাই , পোলাও ও রান্না করতে পারে না । অথচ রমজানের শিক্ষাই হচ্ছে সবাই নতুন কাপড় কিনবে এবং তা পরিধান করেই ঈদ উদযাপন করবে । একই সাথে রমজানের শিক্ষা হচ্ছে সবার ঘরেই সেমাই পোলাও রান্না হবে। ধনী লোক এবং তাদের ছেলেমেয়েরা ঈদের জন্য একাধিক নতুন জামা , জুতা এবং আরো অনেক কিছু কিনে , যার প্রত্যেকটিই নামী এবং দামী । অথচ এই সব ধনী লোক এবং তাদের ছেলেমেয়েরা প্রত্যেকই যদি একটি করে জামা এবং জুতা কিনে আর বাকি টাকা দিয়ে গরীব লোক এবং তাদের ছেলেমেয়েদের জন্য একটি করে নতুন জামা এবং জুতা কনে দেয় , তাহলে কিন্তু সমাজের সব মানুষেরই নতুন জামা এবং জুতা হয়ে যাবে তখন সবার মাঝেই আনন্দ থাকবে এবং ঈদুল ফিতর হবে আনন্দময় । আর এটাই হচ্ছে রমজানের শিক্ষা । সুতরাং আসুন আমরা সবাই রোজা পালন করার সাথে সাথে রমজানের প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হই এবং সেই শিক্ষায় জীবনকে সাজাই ।
পবিত্র রমজান মাস যখন আমাদের সামনে সমাগত , তখন মুসলিম ভাইদের প্রতি আমার ছোট্র একটি আবেদন, তা হচ্ছে -আপনারা রমজানকে সম্মান করুন , ঠিকমত রোজা পালন করুন এবং কোন অবস্থাতেই রমজানের পবিত্রতা ক্ষুন্ন করবেন না। আমরা যেন কোন অবস্থাতেই রমজানের সিয়াম সাধনার চেয়ে অন্য কিছুকে বেশি গুরুত্ব না দিই । সবার আগে রোজাকে গুরুত্ব দিন । আর অমুসলিম ভাইদের প্রতি বিনীত অনুরোধ , আপনারা দৈনন্দিন কাজ করতে গিয়ে এমন কোন পরিবেশের সৃষ্টি করবেন না , যাতে রমজানের পবিত্রতা ক্ষুন্ন হয় এবং রোজা পালনে মুসলমানদের কোন ধরনের অসুবিধা হয় । মনে রাখতে হবে ধর্ম একটি অতীব পবিত্র জিনিস আর অপরকে ধর্ম পালনে সহযোগিতা করাটা একজন নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। অপরদিকে নিশ্চিন্তে এবং নির্বিঘ্নে ধর্ম পালন করাটা ও একজন নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। সুতরাং রমজানের পবিত্রতা রক্ষা করা এবং মুসলমানদের রোজা পালনে সহযোগিতা করাটা সবারই নৈতিক দায়িত্ব । অপরদিকে ইসলাম সবসময় মানব কল্যাণের জন্য মানবজাতিকে নির্দেশ দিয়েছে। কারন পৃথিবীতে একটি সুন্দর , কল্যানময় এবং সম্প্রীতির সমাজ গঠনের জন্যই ইসলামের আর্ভিভাব । তাই ইসলাম সবসময় সত্য ও সুন্দরের কথা বলেছে , মানবপ্রেমের কথা বলেছে, মানবতার কথা বলেছে , ন্যায় বিচারের কথা বলেছে। একই সাথে হিংসা, বিদ্বেষ, লোভ , লালসা সহ যাবতীয় মিথ্যা এবং অন্যায়কে বর্জন করতে ইসলাম মানবজাতিকে নির্দেশ দিয়েছে। আসুন আমরা ইসলামের এই শিক্ষাকে গ্রহন করি । আমরা সবাই যেন প্রতিদিন একটু হলে ও কোরান পড়ি এবং কেউ যেন কোরান পড়তে ভুলে না যাই । আমরা যেন পবিত্র কোরান অধ্যয়নের জন্য ও কিছুটা সময় ব্যয় করি। আমরা যেন সুদ, ঘুষ , দুর্নীতি , জুলুম এবং অবিচার চিরতরে বন্ধ করি। আসুন আমরা মাদক ও যৌতুককে চিরতরে বর্জন করি । হিংসা , বিদ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা, গীবত এবং পরনিন্দাকে আমরা চিরতরে পরিহার করি । আসুন আমরা সমাজে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করি । আমরা অপেক্ষাকৃত অপ্রয়োজনীয় কাজে এবং বিনোদনের জন্য অনেক সময় অনেক টাকাই ব্যয় করি । আসুন আমরা অপ্রয়োজনীয় কাজে অর্থব্যয় বন্ধ করি এবং সেই টাকাটা এ সমাজের গরীব দু:খী অসহায় ও বিপন্ন মানুষের দু:খ দুর্দশা লাঘবের জন্য ব্যয় করি । আসুন আমরা জাকাতটা ঠিক ভাবে আদায় করি এবং জাকাতের অর্থ ইসলাম নির্দেশিত খাতসমুহে ব্যয় করি । ঈদুল ফিতরের আগেই ফিতরার টাকা পরিশোধ করি । অন্য কাজে আমাদের সময় এবং অর্থব্যয়টা যেমন স্বত:স্ফুর্ত , ঠিক ইসলামের বিধান পালন করা এবং ইসলামের নির্দেশিত পথে অর্থব্যয়ের ক্ষেত্রে ও আমাদেরকে তেমনি স্বত:স্ফুর্ত হতে হবে। আল্লাহকে ভালবাসতে হবে সবার আগে । আল্লাহর নির্দেশিত বিধিবিধান পালন করতে হবে সবার আগে। আললাহ প্রদত্ত এবং রাসুল (সা:) প্রদর্শিত জীবন অনুসরন করতে হবে । না হলে আমরা নিশ্চিতভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হব , যে ক্ষতি পুষিয়ে আনা কোন দিনও সম্ভব নয় । এই রমজানই কিন্তু আপনার জীবনের শেষ রমজান হতে পারে । আপনি যে আরো একটি বছর বাচঁবেন , সুস্থ থাকবেন এবং রোজা পালন করতে পারবেন , তার কিন্তু কোন নিশ্চয়তা নেই । জীবন কিন্তু একটাই । আপনি ইচ্ছা করলে ও এই পৃথিবীতে দ্বিতীয়বার আসতে পারবেন না । সুতরাং এই রমজানকে কাজে লাগান , জীবনকে পরিশুদ্ধ করুন এবং শ্রষ্টার নির্দেশিত পথে জীবনকে পরিচালিত করুন । আপনার সন্তান এবং পরিবারের সবাইকে রমজানের শিক্ষায় উদ্ভুদ্ধ করুন । সত্য ও সুন্দরের পুজারী হিসাবে মানবজাতির প্রতি আমার বিনীত আবেদন, জীবনের মোহে আমরা যেন আমাদের ধর্ম ও সংস্কৃতিকে ভুলে না যাই । আমরা যেন হীরাকে বাদ দিয়ে কাচঁকে সংরক্ষণ না করি । তাহলেই আমাদের জীবন সুন্দর এবং সার্থক হবে । আসুন সত্য ও সুন্দরের পথে নিরন্তর অভিযাত্রায় আমরা সবসময় অবিচল আস্থায় পথ চলি ।
লেখক : প্রকৌশলী ও কলামিষ্ট
খুলনাটুডে.কম | খুলনা বিভাগের সকল সংবাদ সবার আগে