খুলনায় তালিকাভুক্ত অধিকাংশ ওয়াকফ সম্পদের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। যেগুলোর অস্তিত্ব রয়েছে তারাও নিয়মিত হিসাব দেন না। জনবল সংকট থাকায় ওয়াকফ প্রশাসনও এগুলোর তদারকি করে না। ফলে খুলনায় ওয়াকফের কোটি টাকার সম্পদ অবৈধ দখলে চলে যাচ্ছে। আর ওয়াকফ প্রশাসনের কাছে নিবন্ধন না করায় নজরদারির বাইরে রয়েছে শত শত কোটি টাকার সম্পদ।ওয়াকফ বৈধকরণ আইনের সংজ্ঞা অনুযায়ী, ‘ওয়াকফ হলো কোনো মুসলমান কর্তৃক তার সম্পত্তির কোনো অংশ এমন কাজের জন্য স্থায়ীভাবে দান করা, যা ধর্মীয় বা পবিত্র কিংবা সেবামূলক হিসেবে স্বীকৃত।’ সহজ কথায় আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সম্পদ দান করাকে ওয়াকফ বলা হয়। খুলনার অসংখ্য মসজিদ, মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এই ওয়াকফ সম্পদের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে। ওয়াকফকৃত সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার জন্য ১৯৩৪ সালের বেঙ্গল ওয়াকফ অ্যাক্টের আওতায় গঠন করা হয়েছে ওয়াকফ প্রশাসন। ওয়াকফ করা সম্পদগুলোকে একেকটি এস্টেট বলা হয়ে থাকে। আর যারা এই সম্পদ দেখা শোনার দায়িত্বে থাকেন তাদের বলা হয় মোতওয়াল্লী। জেলা পর্যায়ে ওয়াকফ হিসাব নিরীক্ষক পদমর্যাদার ব্যক্তিরা ওয়াকফ স্টেট দেখাশোনা করে থাকেন। খুলনার ওয়াকফ হিসাব নিরীক্ষককের কার্যালয় থেকে জানা গেছে, খুলনায় নিবন্ধিত ওয়াকফ স্টেট রয়েছে মাত্র ৫৮টি। এখানে মোট কি পরিমাণ সম্পদ আছে-তার তালিকা বা হিসাব এই দপ্তরে নেই। তবে দায়িত্বরত নিরীক্ষক মোস্তাফিজুর রহমানের ধারণা এসবের মোট সম্পদের পরিমাণ ১৭০ একরের কাছকাছি। এর মধ্যে মাত্র ২০টি ওয়াকফের মোতওয়াল্লীরা ৯৭ একর জমির হিসেব নিয়মিত দেন। বাকিগুলোর কোনো অস্তিত্বই নেই।সূত্রটি জানায়, খুলনা নিবন্ধিত বেশিরভাগ ওয়াকফ এস্টেটে মসজিদ ও মাদ্রাসা এবং দোকান পাঠ গড়ে উঠেছে। এছাড়া বিলের জমিও সম্পদের তালিকায় আছে। দেখা যাচ্ছে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনার জন্য ওয়াকফ জমিতে মার্কেট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। মূলত এসব সম্পদের হিসাব দেননি দায়িত্বপ্রাপ্তরা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বটিয়াঘাটা উপজেলার শেখ এবাদত হোসেন এস্টেটের জমি ছিলো প্রায় ৫৭০ একর। কিন্তু কাগজে কলমে আছে মাত্র ৪৩ দশমিক ৮৭ একর। বাকি জমি বিভিন্ন লোকের কাছে বিক্রি হয়ে গেছে। বর্তমান মোতওয়াল্লী মশিউর রহমান দীর্ঘদিন এই জমিরও হিসাব দিচ্ছেন না।শিরোমনি উত্তরপাড়ার হাজী মোজাম শেখ এস্টেটের জমিতে মসজিদ ও বেশকিছু দোকান ঘর তৈরি করা হয়েছে। দোকান ঘরের কোনো হিসাব জমা দেন না মোতোওয়াল্লী শেখ মোহাম্মদ আলী। পাইকগাছা উপজেলার নগর শ্রীরামপুরে মফিজ উদ্দিন সরকার ৫৩ শতক জমি দীর্ঘদিন আগে ওয়াকফ করে যান। ৬৭২৫ নম্বর নিবন্ধনের এই ওয়াকফ সম্পদের এখন কোনো হদিস নেই।
খুলনার আরেকটি বড় ওয়াকফ এস্টেট হচ্ছে শেখ মোঃ ইউসুফ স্টেট। সম্প্রতি এর মোতওয়াল্লী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন খুলনা-২ আসনের সাংসদ আলী আজগর লবী। এই এস্টেটের সম্পদের পরিমাণ ছিলো প্রায় ১০০ একর। এখন কাগজে কলমে মাত্র ২২ একর জমি রয়েছে। তারা নিয়মিত হিসাব দেন।খুলনার ওয়াকফ হিসাব নিরীক্ষক মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নিবন্ধিত ওয়াকফ এস্টেটের কার্যক্রম তদারকি করা আমাদের কাজ। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে অধিকাংশ এস্টেট খুঁজে পাওয়া যায় না। অনেকে মৌখিকভাবে, অনেকে দীর্ঘদিন আগে এসব জমি দান করায় জমির সঠিক দলিল খুঁজে পাওয়া যায় না। এজন্য বেশিরভাগ জমিই অবৈধ দখলে চলে যায়। জনবল সংকট এবং কাগজপত্র না থাকায় জমি উদ্ধারেরও চেষ্টাও গতি পায় না।তিনি বলেন, খুলনায় ওয়াকফ এস্টেট আছে প্রায় দেড় হাজারেরও বেশি। কিন্তু নিবন্ধিত আছে মাত্র ৫৮টি। এই অনিবন্ধিত এস্টেটের শত শত কোটি টাকার সম্পদের কোনো হিসাব কারও কাছে নেই। মোতওয়াল্লী বা স্থানীয় কমিটিই এসব লুটে পুটে খাচ্ছে। নিবন্ধন না থাকায় তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ারও এখতিয়ার নেই।
খুলনাটুডে.কম | খুলনা বিভাগের সকল সংবাদ সবার আগে