জালাল উদ্দিন ওমর:
২০১৬ সালের শেষ সপ্তাহে সিরিয়ার সরকারী বাহিনী বিদ্রোহীদের হাত থেকে দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী আলেপ্পো উদ্ধার করেছে এবং আলেপ্পোর ওপর তাদের নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করেছে । এর মাধ্যমে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আসাদ বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে চুড়ান্ত বিজয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। অপরদিকে তিন বছরেরও বেশী সময় বিদ্রোহীদের দখলে থাকা আলেপ্পো নগরী বিদ্রোহীদের হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় বিদ্রোহীরা এখন চুড়ান্ত পরাজয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মুলতপক্কে আলেপ্পোর যুদ্ধের ফলাফলটা যুদ্ধরত উভয় পক্ষের জন্য একটি টার্নিংপয়েন্ট। আলেপ্পোর যুদ্ধে বিজয় আসাদের ক্ষমতাকে যেমন আরো সংহত করেছে, ঠিক তেমনি আলেপ্পোর যুদ্ধে বিদ্রোহীদের পরাজয় পুরো বিদ্রোহী শিবিরকে বিপর্যস্ত করেছে। সাথে সাথে যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিমা বিশ্ব, ইসরাইল, তুরস্ক, সৌদি আরব এবং কাতারের সিরিয়া নীতির পরাজয় ঘটতে চলেছে। অপরদিকে রাশিয়া, চীন, ইরান এবং হিজবুল্লাহর সিরিয়া নীতির বিজয় ঘটতে চলেছে। তবে এর মাধ্যমে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ বন্ধ হবার একটি সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। আমরা আশা করব, সিরিয়ার যুদ্ধটা এবার বন্ধ হবে। পাঁচ বছরের ও বেশী সময় ধরে চলে আসা অর্থহীন এই গৃহযুদ্ধে ধ্বংস ছাড়া সিরিয়ার মানুষেরা আর কিছুই অর্জন করেনি । এই যুদ্ধে দেশটিও কেবল ধ্বংস হয়েছে। সুতরাং অনেক হয়েছে, এবার যুদ্ধটা বন্ধ করে সিরিয়ার মানুষদেরকে একটু বাচঁতে দিন ।
সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাসার আল আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করতে দীর্ঘ পাঁচ বছরের ও বেশী সময় ধরে বিদ্রোহীরা যুদ্ধ করেছে । বিদ্রোহীদেরকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক ভাবে সাহায্য করেছে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্ব, সাথে ছিল তুরস্ক, সৌদি আরব এবং কাতার সহ বেশ কয়েকটি মুসলিম দেশ। পিছন থেকে ইসরাইল কলকাঠি নেড়েছে । অপরদিকে আসাদের পক্ষে আছে ইরান, রাশিয়া, চীন ও লেবাননের হিজবুললাহ । আসাদের পক্ষে রাশিয়া বিমান হামলা চালাচ্ছে। এ যুদ্ধে ইতিমধ্যেই পাঁচ লক্ষ মানুষ নিহত হয়েছে এবং চল্লিশ লক্ষ মানুষ উদ্ধাস্তু হয়েছে । এর মধ্যে ত্রিশ লক্ষ তুরস্কের উদ্ধাস্তু শিবিরে বসবাস করছে।যাদের এক সময় অর্থ, বিত্ত, আভিজাত্য সবই ছিল তারা এখন সব হারিয়ে শরনার্থী শিবিরে মানবেতর জীবন যাপন করছে। এ যুদ্ধে ধ্বংস হয়েছে হাজার হাজার ঘরবাড়ি, মসজিদ-মাদ্রাসা, স্কুল কলেজ সহ অসংখ্য স্থাপনা। প্রতিদিনই প্রান হারাচ্ছে অসংখ্য নিরাপরাধ আবাল বৃদ্ধ বনিতা। নিজ ঘরবাড়ি ছেড়ে প্রতিদিনই অসহায় মানুষেরা বাঁচার তাগিদে বিদেশের উদ্বাস্তু শিবিরে আশ্রয় নিচ্ছে। ধ্বংসযজ্ঞ চলছেই । ইরাক এবং লিবিয়ার মত সিরিয়ায় সামরিক আগ্রাসন চালানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্ব জাতিসংঘে একাধিকবার প্রস্তাব তুলেছে। কিন্তু রাশিয়া এবং চীন প্রতিবারই তাতে ভেটো দিয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোট আসাদকে উৎখাতে সামরিক অভিযান চালাতে পারেনি । আসাদ বিরোধী বিদ্রোহীদের সকল তৎপরতার হেড কোয়াটার তুরস্কে অবস্থিত। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগানের প্রত্যক্ষ তত্বাবধানে তুরস্কের মাটি থেকে আসাদ বিরোধী কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে । বিদ্রোহীদের অফিস, সামরিক প্রশিক্ষন কেন্দ্র এবং রাজনৈতিক তৎপরতা সবই তুরস্কে মাটিতে। তুরস্কের সাথে সিরিয়ার দীর্ঘ সীমান্তের সুযোগে বিরোধীরা অবাধেই তুরস্ক হয়ে অস্ত্র পেয়েছে। আসাদ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সৌদি আরব এবং কাতার অকাতরে অর্থ ব্যয় করেছে । কিন্তু পাঁচ বছর ধরে পশ্চিমাদের সকল তৎপরতা এবং বিদ্রোহীদের সকল যুদ্ধকে মোকাবেলা করে আসাদ এখনো শক্তহাতে ক্ষমতাকে ধরে রেখেছে। প্রাথমিক ভাবে বিদ্রোহীরা যুদ্ধে সফলতা দেখালেও পরবর্তীতে আস্তে আস্তে পিছু হটেছে। দখলকৃত এলাকাগুলো সরকারী বাহিনী আবারো পুনরুদ্ধার করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় তারা আলেপ্পো নগরী পুনরুদ্ধার করেছে । এর মাধ্যমে আসাদ যেমন চুড়ান্ত বিজয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তেমনি বিদ্রোহীরা চুড়ান্ত পরাজয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ।
পশ্চিমাদের প্রত্যক্ষ উদ্যোগে এবং জাতিসংঘের তত্বাবধানে মুসলিম ভুখন্ডে ১৯৪৭ সালে ইসরাইলের প্রতিষ্টা । এই ইস্যুতে ইসরাইলের সাথে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর যুদ্ধ হয়েছে, যাতে ইসরাইল বিজয়ী হয়েছে। এই যুদ্ধে সিরিয়ার গোলান মালভুমি, মিসরের সিনাই উপত্যকা এবং ফিলিস্তিনের অধিকাংশ ভুখন্ড ইসরাইল দখল করে । সিরিয়া হচ্ছে একমাত্র মুসলিম দেশ যে কখনো ইসরাইলের সাথে আপোষ করেনি। প্রথম থেকেই ইসরাইলের সাথে সিরিয়ার বৈরিতা, যা এখনো বিদ্যমান । সিরিয়া ছিল বরাবরই সাবেক সোভিয়েত ব্লকের সাথে সংশ্লিষ্ট । বছরের পর বছর ধরেই সিরিয়ার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল এবং পশ্চিমা বিশ্বের বৈরিতা চলে এসেছে । সিরিয়ার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবরোধ এবং নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যমান। ইসরাইলের শত্রু হামাস এবং হিজবুললাহকে সাহায্য সহযোগিতা করার কারনে সিরিয়া হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের শত্রু। ১৯৭৯ সালে মিশরের সাথে ইসরাইলের শান্তি চুক্তির পর থেকে মিশর হয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু এবং ইসরাইলের স্বার্থরক্ষাকারী । অপরদিকে ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পর থেকেই ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুত্ব ছিন্ন হয়ে যায় এবং ইরান যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান শত্রুতে পরিনত হয়। এ অবস্থায় ইরানের সাথে সিরিয়ার গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যা এখনো অটুট আছে। ইরান এবং সিরিয়া ফিলিস্তিনের হামাস এবং লেবাননের হিজবুল্লাহকে সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা করে। ইরান, সিরিয়া, হামাস এবং হিজবুললাহর সমন্বয়ে একটি জোট গড়ে ওঠে, যারা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের স্বার্থের বিরোধীতা করে। ইসরাইল এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের দীর্ঘ বৈরিতা । ২০১১ সালে জনতার আন্দোলন তিউনিসিয়া এবং মিশরে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের বন্ধু সরকারের পতন এবং নির্বাচনের মাধ্যমে দেশ দুটিতে ইসলামপন্থীদের ক্ষমতায় আরোহন ছিল যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের জন্য বিরাট বিপর্যয় । মিশর এবং তিউনিসিয়ায় ইসলামপন্থীদের ক্ষমতায় আরোহনে সারা বিশ্বজুড়ে ইসলামপন্থীরা অনুপ্রানিত এবং চাঙ্গা হয়ে ওঠে। ইরানের সাথে মিশরের ৩০বছর কুটনৈতিক সম্পর্ক না থাকলে ও মোবারক পরবর্তী ব্রাদার হুডের সময়ে ইরানের সাথে সম্পর্ক পূনপ্রতিষ্ঠিত হয়। এ অবস্থায় ইরানের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল বিরোধী জোট শক্তিশালী হতে শুরু করে । এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রকে পেয়ে বসে সাম্রাজ্য হারানোর ভয় আর ইসরাইলকে পেয়ে বসে অস্তিত্ব হারানোর ভয়। এই সংকট উত্তরনে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্ব এবং ইসরাইল দুটি পরিকল্পনা গ্রহন করে। তাদের পরিকল্পনার একটি অংশ হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোতে ক্ষমতাসীন তাদের অনুগত শাসকদেরকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখা। এজন্য তারা সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, আরব আমিরাত, জর্ডান, মরক্কো, ফিলিস্তিন এবং বাহরাইন সহ আরো অনেক দেশের ক্ষমতাসীন সরকারদেরকে নি:শর্ত সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। এসব দেশে সরকার বিরোধী গনতান্ত্রিক আন্দোলনকে কঠোর ভাবে দমন করা হচ্ছে। পশ্চিমারা এসবের নিরব সমর্থক। তাদের দ্বিতীয় পরিকল্পনা, মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশে ক্ষমতাসীন তাদের বিরোধী সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা। এজন্য পশ্চিমারা এসব দেশে গনতান্ত্রিক আন্দোলনকে সমর্থন এবং সহযোগিতা করছে। প্রয়োজনে গনতন্ত্র এবং জনগনের অধিকার প্রতিষ্টার শ্লোগান দিয়ে সেখানে সামরিক আগ্রাসন চালাবে এবং তাদের বিরোধীদেরকে ক্ষমতাচ্যুত করবে। এরই অংশ হিসাবে প্রথমেই তারা দীর্ঘদিনের শত্রু লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট মোয়াম্মার গাদ্দাফীকে ক্ষমতাচ্যুত করার পরিকল্পনা গ্রহন করে। গনতন্ত্র এবং জনগনের অধিকার প্রতিষ্টার কথা বলে তারা লিবিয়ায় হামলার জন্য জাতিসংঘে প্রস্তাব পাশ করে এবং পশ্চিমা বিশ্ব লিবিয়ায় সামরিক হামলা শুরু করে। লিবিয়ার অবিসংবাদিত নেতা গাদ্দাফী তার বাহিনী নিয়ে পশ্চিমাদের সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে যুদ্ধ করেন। তিনি তার তিন সন্তান সহ জীবন দেন। এভাবে পশ্চিমারা গনতন্ত্র প্রতিষ্টার নামে লিবিয়ার শাসক গাদ্দাফীকে ক্ষমতাচ্যুত করেন এবং নির্মমভাবে হত্যা করেন। আর দেশটিকে ধ্বংস করেন। গাদ্দাফী পরবর্তী লিবিয়া আজ এক ধ্বংসের জনপদ। লিবিয়ার জনগন আজ গনতন্ত্র এবং মানবাধিকার কিছুই পায়নি। এখানেও পশ্চিমাদের আগ্রাসনের প্রধান সহযোগী হিসাবে কাজ করেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান, সাথে ছিল কাতার এবং সৌদি আরব। লিবিয়াকে ধ্বংস করার পর যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল মিশরের ক্ষমতা থেকে ইসলামপন্থী প্রেসিডেন্ট ড:মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করার পরিকল্পনা গ্রহন করে। পশ্চিমারা পাশ্চাত্য বিরোধী ড:মুরসিকে কৌশলে আরেক পাশ্চাত্য বিরোধী আসাদের বিরুদ্ধে লাগিয়ে দেন। এক্ষেত্রেও পশ্চিমাদের পক্ষে প্রধান ত্রানকর্তার ভুমিকায় অবতীর্ন হয়েছে এরদোগান। তিনি আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করতে আসাদ বিরোধী পদক্ষেপ নিতে মুরসিকে উদ্ধুদ্ধ করেন যা পশ্চিমাদেরই আসল পরিকল্পনা। একপর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল বিরোধী মিশরের প্রেসিডেন্ট ড: মুরসি, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের আরেক শত্রু আসাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্নের ঘোষনা দেন। এটা ছিল মুরসির ঐতিহাসিক ভুল। পশ্চিমা বিশ্ব এটাই চেয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের দুই প্রতিপক্ক ড:মুরসি এবং আসাদ যখন নিজেরাই নিজেদের প্রতিপক্ক হয়ে গেছে তখনই পশ্চিমারা ড: মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করার কাজটি সম্পন্ন করে। পশ্চিমারা মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করার কাজ তাড়াতাড়িই শুরু করে এবং আসাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্নের দুই মাসের মধ্যেই ড: মুরসি ক্ষমতাচ্যুত হন। গনতন্ত্র হত্যাকারী মিশরের সেনাবাহিনীকে নিরবে সমর্থন করে যুক্তরাষ্ট্রও পশ্চিমা বিশ্ব। মিশরের সেনাবাহিনী গনতন্ত্রের জন্য সংগ্রামরত কয়েক হাজার মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করলেও গনতন্ত্র এবং মানবাধিকারের প্রবক্তা যুক্তরাষ্ট্র সেনাবাহিনীর পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে। লিবিয়ার গাদ্দাফী এবং মিসরের ড: মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল তাদের আরেক শত্রু সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য কাজ করছে। এখানেও পশ্চিমাদের প্রধান সহযোগী তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান। তিনি পশ্চিমাদের হাতের পুতুল হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে। তুরস্কের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা না পেলে লিবিয়ার ক্ষমতা থেকে গাদ্দাফীকে উৎখাত করতে পশ্চিমা বিশ্ব কখনোই সফল হত না। একই ভাবে তুরস্কের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা না পেলে সিরিয়ার আসাদ বিরোধী যুদ্ধ কখনোই এতটুকু অগ্রসর হত না । একইভাবে তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী এরদোগানের প্রত্যক্ষ প্ররোচনায় মুরসি যদি আসাদের বিরুদ্ধে অবস্থান না নিত তাহলে মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করার পশ্চিমা পরিকল্পনা কখনোই বাস্তবায়িত হত না। মুরসির উচিত ছিল নিজ দেশে আগে ক্ষমতাকে সুসংহত করা এরপর অন্য দেশে গনতন্ত্র প্রতিষ্টা করা। কিন্তু তা না করায় এখন সবই গেছে। এরদোগানের ভুল পররাষ্ট্রনীতি মুসলিম বিশ্বের হাজারো সম্ভাবনাকে অংকুরেই ধ্বংস করে দিয়েছে এবং মুসলিম বিশ্বকে শত বছরের জন্য পিছনে ঠেলে দিয়েছে। এরদোগানের ভুল নীতি আরব বসন্তের সকল সম্ভাবনাকে ধ্বংস করেছে । অবশ্য এরদোগান এখন তার ভুল বুঝতে পেরেছেন, কিন্তু ততক্ষণে সবই শেষ। এরদোগান এজন্য প্রেসিডেন্ট আসাদকে ক্ষমতাচ্যুতির নীতি থেকে সরে এসেছে এবং এখন আবার সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আসাদের মিত্র রাশিয়া এবং ইরানের সাথে হাত মিলিয়েছে। এর মাধ্যমে এরদোগানের আসাদ বিরোধী নীতি চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। মাঝখান দিয়ে এরদোগানকে ব্যবহার করে পশ্চিমারা সিরিয়াকে ধ্বংস করেছে । মনে রাখতে হবে আবেগ আর বাস্তবতা ভিন্ন জিনিস। আবেগ দিয়ে পুরো পৃথিবীকে জয় করার স্বপ্ন দেখা যায়, কিন্তু বাস্তবতায় সামান্য একটি ভুখন্ড ও জয় করা কঠিন । মুসলিম বিশ্বকে ধ্বংস করার জন্য পশ্চিমাদের যে মহাপরিকল্পনা, তার অংশ হিসাবে পশ্চিমারা ইরাকে আগ্রাসন চালিয়ে সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুতি এবং ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে। তারা ইরাককে ধ্বংস করেছে । একইভাবে আফগানিস্তানে সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে তালেবানদেরকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে এবং কয়েক লক্ষ আফগান মুসলমানকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। ইরাক, আফগানিস্তান এবং লিবিয়াকে ধ্বংস করার পর তারা সিরিয়াকে ধ্বংস করার মহোৎসবে মেতে উঠে। এক্ষেত্রে গনতন্ত্র এবং মানবাধিকার প্রতিষ্টা মোটেই তাদের আসল উদ্দেশ্য নয়। এজন্যই ১৯৯১ সালে আলজেরিয়ার নির্বাচনে ইসলামপন্থীরা বিজয়ী হলেও পশ্চিমার তাদেরকে ক্ষমতায় আসতে দেয়নি। ২০০৬ সালে ফিলিস্তিনের নির্বাচনে ইসলামপন্থী হামাস বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসলে ও তাদেরকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে। আর মিসরের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ড :মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করা তারই ধারাবাহিকতা।
রাজনীতির সম্পর্কের বেসিক নীতি হচ্ছে শত্রুর শত্রু বন্ধু, শত্রুর বন্ধু শত্রু। একইভাবে বন্ধুর বন্ধু বন্ধু আর বন্ধুর শত্রু শত্রু । যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু বলেই চীন, রাশিয়া, উত্তর কোরিয়া সাথে ইরানের ভাল সম্পর্ক। যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু বলেই সিরিয়ার সাথে চীন, রাশিয়া এবং ইরানের ভাল সম্পর্ক। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের শত্রু বলেই হামাস এবং হিজবুল্লাহর সাথে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আসাদের ভাল সম্পর্ক। এই সমীকরন রাজনীতিবিদদেরকে বুঝতে হবে এবং এই সমীকরন ভুল করলে বিপর্যয় অনিবার্য । তাই যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্ব চেয়েছে তাদের শত্রু আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করতে অপরদিকে চীন-রাশিয়া-ইরান তাদের মিত্র আসাদকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে চায়। আর আসাদের পতন হলে হামাস-হিজবুললাহ-ইরান সবাই দুর্বল হবে। দুর্বল হবে মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়া এবং চীনের শক্তি। বাড়বে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের শক্তি। তবে আসাদ যেহেতু বরাবরই যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের কট্টর বিরোধী একজন মানুষ সেজন্য আন্দোলনের মাধ্যমে এবং বিদ্রোহীদের লড়াইয়ে আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করা সম্ভব হয়নি । কারন মুসলিম দেশগুলোর শাসকদের মধ্যে যারা পশ্চিমা বিরোধী তারা স্বৈরশাসক হলেও তাদের ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। এই কারনে লিবিয়ার গাদ্দাফীকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পশ্চিমা বিশ্বকে ছয় মাস ধরে সামরিক আগ্রাসন চালাতে হয়েছে। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আসাদের বেলায়ও ব্যাপারটা শতভাগ সত্য। এজন্যই আসাদ এখনো ক্ষমতায় টিকে আছে এবং ভবিষ্যতেও টিকে থাকবে। আর সিরিয়ায় আগ্রাসন চালাতে গেলে জাতিসংঘের অনুমোদন লাঘবে যেটা রাশিয়া এবং চীনের ভেটো প্রদানের ফলে সম্ভব হয়নি । তাছাড়া পশ্চিমাদের গনতন্ত্র এবং মানবাধিকারের শ্লোগানের প্রতি মানুষের তেমন আস্থা নেই। ইরাক, আফগানিস্তান এবং লিবিয়ার পরিনতি মানুষ তো দেখতে পাচ্ছে। বিদ্রোহীরা আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য লড়াই করলেও তাদের প্রতি জনগনের তেমন সমর্থন নেই। তারা বহুদা বিভক্ত এবং লক্ষ্যহীন। যুদ্ধের ময়দানে ইসলামপ্রিয় কিছু মানুষ যুদ্ধ করলে ও তাদের নেতারা সেকুলার এবং পশ্চিমাপন্থী, যার নিয়ন্ত্রন যুক্তরাষ্ট্রও তার মিত্রদের হাতে। তারা যে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের প্রতি অনুগত তা পরিস্কার। এজন্য তাদের তেমন জনপ্রিয়তা নেই এবং তাদের সফল হবার কোন সম্ভাবনা নেই। এটাই বাস্তবতা । আর এজন্যই বিদ্রোহীরা তাদের দখলকৃত এলাকাসমুহ হাতছাড়া করতে করতে সর্বশেষ আলেপ্পো নগরী ও হাত ছাড়া করেছে। মুলতপক্ষে পশ্চিমা বিশ্ব, তুরস্ক এবং তাদের আরব মিত্রদের সাহায্য সহযোগিতার কারনেই তারা এতদিন টিকে ছিল । কিন্তু তুরস্ক এখন আসাদের ক্ষমতাচ্যুতি থেকে সরে আসায় এবং আসাদের মিত্র রাশিয়া ও ইরানের সাথে যোগ দেয়ায় আসাদের বিজয় এবং বিদ্রোহীদের পরাজয় অনিবার্য হয়ে ওঠেছে ।
এ অবস্থায় সিরিয়ার অর্থহীন যুদ্ধটা বন্ধ করাটাই হচ্ছে প্রধান কাজ। তার জন্য প্রথমেই স্থায়ী ভাবে যুদ্ধ বিরতি কার্যকর করতে হবে। প্রেসিডেন্ট আসাদের উচিত হবে বিদ্রোহীদেরকে ক্ষমা করে দেয়া এবং তাদেরকে সাথে নিয়ে দেশটিতে ঐক্য প্রতিষ্টা করা। আর বিদ্রোহীদের উচিত হবে অস্ত্র পরিত্যাগ করে অতীত ভুলের জন্য ক্ষমা চাওয়া এবং নিজেদেরকে ঐক্যবদ্ধ সিরিয়ার অংশ করা। বিদ্রোহীদেরকে বুঝতে হবে, আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করার কোন সম্ভাবনা এখন আর নেই । একইভাবে আসাদ বিরোধী যুদ্ধে বিজয়ী হবার কোন সম্ভাবনা ও বিদ্রোহীদের নেই । এটাই সিরিয়ায় চলমান যুদ্ধের বাস্তবতা। আর বাস্তবতাকে মেনে নেয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ এবং বাস্তবতাকে মেনে নেয়ার মধ্যেই কল্যাণ। সুতরাং রাজনৈতিক উপায়েই সিরিয়া সংকটের সমাধান করুন। তাই সিরিয়ার সকল পক্ষের প্রতি আবেদন, আপনারা আলোচনায় বসুন এবং অতীতের তিক্ততা ভুলে সমঝোতায় এসে সিরিয়ার ঐক্য, স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষা করুন। আত্মঘাতী এবং সর্বনাশা এই যুদ্ধ চিরতরে বন্ধ করুন । যুদ্ধ বন্ধ করে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্টা করুন এবং ধ্বংস হওয়া দেশটিকে পূর্নগঠন করুন। বিদেশে উদ্বাস্তু শিবিরে বসবাসরত সিরিয়ার সকল নাগরিককে দেশে ফিরে আনুন এবং তাদেরকে নিজ বসতভিটায় নির্ভয়ে বসবাসের সুযোগ দিন । আর এটাই সমাধান । দীর্ঘ ছয় বছরের গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত সিরিয়ায় নতুন বছরটা শান্তি বনে আনুক , এটাই প্রার্থনা ।
লেখক : প্রকৌশলী এবং উন্নয়ন গবেষক ।
খুলনাটুডে.কম | খুলনা বিভাগের সকল সংবাদ সবার আগে



