জালাল উদ্দিন ওমর:
একটি র্দুঘটনা মানে হচ্ছে, সারা জীবনের জন্য কান্না। একটি দুর্ঘটনা মানে হচ্ছে সারা জীবনের দুর্বিসহ যন্ত্রনা। পত্রিকার পাতা আর টিভির পর্দায় চোখ রাখলেই প্রতিদিনই দেখতে পাই এসব দুর্ঘটনার খবর। যাত্রাপথে এই সব দুর্ঘটনার খবর যেন নিত্যদিনেরই একটি স্বাভাবিক চিত্র। দুর্ঘটনায় প্রানহানি কিংবা অঙ্গহানি ঘটেই চলেছে। প্রতিদিনই কোন না কোন স্থানে দুর্ঘটনা হচ্ছে। স্থল পথে কখনো সড়ক দুর্ঘটনা, নদী পথে কখনো লঞ্চ র্দুঘটনা, রেল পথে কখনো ট্রেন র্দুঘটনা আবার আকাশ পথে কখনো বিমান দুর্ঘটনা। প্রতিনিয়ত সংঘটিত এসব দুর্ঘটনায় নিহত হচ্ছে অনেক মানুষ । সারা জীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরন করছে হাজারো জনতা। অনেক পরিবার চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে তিলে তিলে গড়ে তোলা ফুলের মত সাজানো সংসার মুহুর্তের মধ্যেই ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। সারা জীবনের স্বপ্ন মুহুর্তেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। অনেক শিশু সারা জীবনের জন্য এতীম হয়ে যাচ্ছে। অনেক মহিলা অল্প বয়সেই বিধবা হচ্ছে। অকস্মাৎ প্রিয়জনকে হারিয়ে অনেকে নিজেকেই হারিয়ে ফেলছে। প্রানপ্রিয় সন্তানকে হারিয়ে অনেক পিতা মাতা সারা জীবনের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে। কত উৎসব যে দুঘটনার কারনে বিষাদে পরিনত হয়েছে, তার কোন হিসাব নেই। একটি দুর্ঘটনা মানে স্বজন হারানোর মর্মস্পর্শী বেদনা। স্বজন হারা মানুষদের বুকফাটা কান্নায় আকাশ তখন ভারি হয়ে ওঠে আর মানবতা হাহাকার করে। অথচ আমাদের একটু সচেতনতা, সাবধানতা এবং দায়িত্বশীলতা এসব দুর্ঘটনা অনেকাংশেই বন্ধ করতে পারে এবং বাঁচাতে পারে হাজারো মানুষের জীবন। সুতরাং আসুন আমরা সবাই সচেতন হই, সাবধান হই এবং এসব দুর্ঘটনা রোধে এগিয়ে আসি এবং হাজারো মানুষের জীবন রক্ষা করি। আর এই বিষয়ে কোন ধরনের রাজনীতি নয়, সংকীর্নতাও বিভেদ নয়। আসুন আমাদের যাত্রা পথকে সুন্দর, আমারদায়ক এবং নিরাপদ করি ।
দুর্ঘটনায় যাদের জীবন হারিয়ে গেছে তাদেরকে আমরা কিছুতেই আবার ফিরিয়ে আনতে পারব না –একথা নিরেট সত্য । কিন্তু ভবিষ্যতে দুর্ঘটনায় আর কোন মানুষ যেন হারিয়ে না যায় এবং কেউ যেন অঙ্গ হারিয়ে পঙ্গুত্ব বরন না করে তা নিশ্চিত করাটা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। তাই আসুন দুর্ঘটনায় এসব প্রানহানি রোধে আমরা সবাই এগিয়ে আসি । আর আমি মনে করি এটা সম্ভব। আমরা প্রত্যেকেই যদি সড়ক দুঘটনা রোধে এগিয়ে আসি, এ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করি এবং একটু সাবধানে গাড়ি চালাই, তাহলে এই ভয়াবহ বিপর্যয়কে রোধ করা অসম্ভব নয়। মুলতপক্ষে সাবধানতা এবং সচেতনতাই আমাদেরকে এইসব ভয়াবহ দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা করতে পারে। মনে রাখতে হবে এটা একটা জাতীয় সমস্যা। সড়ক দুর্ঘটনায় যারা মারা যাচ্ছে এবং যারা পঙ্গুত্ব বরন করে এখনো বেঁচে আছে—তারা সবাই আমার আপনার মতই একজন মানুষ। তারা প্রত্যেকেই আমাদের কারো না কারো পিতা মাতা, কারো না কারো সন্তান, কারো না কারো ভাইবোন অথবা কারো না কারো আত্মীয়। সর্বোপরি তারা মানুষ। একটি দুর্ঘটনায় ওরা আজ সর্বহারা। তাদের জীবনের এই মর্মান্তিক বিপর্যয়ের জন্য ওরা কেউই দায়ী নয়। কিছু মানুষের দায়িত্বহীনতার কারনেই ওদের এই কষ্টের জীবন। দুর্ঘটনার কারনে আগামীতে ওদের মত আমরা ও হতে পারি বিপদগ্রস্থ। সুতরাং মানবতার স্বার্থেই আসুন সড়ক, নৌ, রেলপথ এবং আকাশপথের দুর্ঘটনাসহ সকল র্দুঘটনাকে প্রতিরোধে এগিয়ে আসি।
প্রতিনিয়তই এসব র্দুঘটনা ঘটছে এবং অসংখ্য মানুষ হতাহত হচ্ছে। এসব দুর্ঘটনায় প্রতিবছর সারা বিশ্বে কয়েক লক্ষ মানুষ মারা যাচ্ছে এবং আরো কয়েক লক্ষ মানুষ সারা জীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরন করছে । বাংলাদেশে ও প্রতিবছর এই দুর্বিসহ জীবনের মুখোমুখি হচ্ছে কয়েক হাজার মানুষ। লক্ক্যনীয় ব্যাপার হচ্ছে –যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি, উন্নত সড়ক ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তির উৎকর্ষতা সমৃদ্ধ গাড়ির প্রচলন সত্ত্বে ও সড়ক দুর্ঘটনা কিন্তু কমেনি। বরং সময়ের সাথে সাথে বেড়েই চলেছে। এর প্রকৃত কারন হচ্ছে, সড়ক দুর্ঘটনার জন্য অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অনুন্নত গাড়ি কোন ভাবেই দায়ী নয়। এসব কেবলমাত্র ভ্রমনকে কষ্টকর করে। এ কথাটি সত্য বলেই উন্নত সড়কের চেয়ে অনুন্নত সড়কে দুর্ঘটনা কম এবং প্রানহানি ও কম। কারন অনুন্নত সড়কে চালকেরা অপেক্ষাকৃত বেশি সাবধানে গাড়ি চালায়। মুলতপক্ষে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য গাড়ির চালকেরাই শতভাগ দায়ী।চালকদের অযোগ্যতা, অদক্ষতা, অসাবধনতা এবং দায়িত্বহীনতাই যানবাহনের এক্সিডেন্টের জন্য দায়ী। চালকের আসনে বসলেই ড্রাইভাররা যেন নিজেকে ধরা ছোয়ার বাইরে মনে করে। বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালাতে থাকে। বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো যেন একটা ফ্যাশন এবং বাহাদুরি। মহাসড়কে ওঠলেই এরা মহা আনন্দে গাড়ি চালাতে থাকে। ওদের গাফিলতির কারনে এই গাড়িটি যে দুর্ঘটনায় পতিত হবে এবং অনেক মানুষের প্রানহানি ঘটবে, সে কথাটি তারা বেমালুম ভুলে যায়। সুতরাং সড়ক দুর্ঘটনা রোধেঁর জন্য প্রধানত চালকদেরকেই সঠিক পথে আসতে হবে। মনে রাখতে হবে সাবধানে গাড়ি চালিয়ে যাত্রীদেরকে নিরাপদে পৌছে দেয়ার মধ্যেই চালকের সার্থকতা এবং সফলতা। একইভাবে যানবাহনটিকে নিরাপদে রাখার মধ্যেই চালকের সফলতা এবং সার্থকতা। আর এসবই চালকের দায়িত্ব এবং কর্তব্য। প্রতিনিয়তই সংঘটিত এসব র্দুঘটনার দুর্দশা সবার সামনে পরিস্কার হলেও, আমরা আসলে এ বিষয়ে এখনো যথেষ্ট সচেতন হইনি। তাই সড়ক দুর্ঘটনা চলছে তো চলছেই। আর মানুষ ও মারা যাচ্ছে সমান তালে। অথচ একটু সতর্ক হলেই ভয়াবহ এই বিপর্যয় রোধ করা সম্ভব। সাবধানতা এবং সতর্কতার সাথে পথ চললে আমাদের জীবন থেকে এসব বিপর্যয়কে দুর করা সম্ভব ।
সড়ক দুর্ঘটনার জন্য যেহেতু প্রধানত চালকেরাই দায়ী, সেহেতু চালক ভাইদের প্রতি আমার বিনীত আবেদন —আপনারা অনুগ্রহ করে আগে গাড়ী চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা, দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা অর্জন করুন । তারপর গাড়ি চালানোর দায়িত্ব গ্রহন করুন। মনে রাখতে হবে আপনার কাজটি অনেক দায়িত্বপূর্ন, গুরুত্বপূর্ন এবং একই সাথে চরম ঝুকিপূর্ন । আপনার যথাযথ দায়িত্ব পালন একদল মানুষের জীবনকে যেমন নিরাপদে গন্তব্যে পৌছাবে, ঠিক তেমনি আপনার খেয়ালীপনা একদল মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিবে।পাশাপাশি সঠিক ভাবে গাড়ি চালালে আপনার জীবন ও নিরাপদ, আবার খেয়ালীপনায় আপনার জীবনও ঝুকিপূর্ন। সুতরাং আপনি দায়িত্ববান হউন, সচেতন হউন। গাড়ি চালানো শুরুর আগে আপনি অনুগ্রহ করে গাড়ির সকল যন্ত্রপাতি ঠিকঠাক আছে কিনা যাচাই করে দেখুন। ইঞ্জিন ঠিকমত কাজ করছে কিনা ভালভাবে যাচাই করুন। প্রয়োজনীয় তেল, মুবিল এবং চাকায় হাওয়া আছে কিনা দেখুন। গাড়ীর ব্রেক সিস্টেম ঠিক আছে কিনা যাচাই করে দেখুন। গাড়ির লাইটিং সিস্টেম এবং যাবতীয় ইন্ডিকেটর গুলো ঠিক আছে কিনা দেখুন । অর্থাৎ যে গাড়িটি দিয়ে আপনি যাত্রা শুরু করবেন, সেই গাড়িটি টেকনিক্যালি শতভাগ ফিট আছে কিনা, তা ভালভাবে যাচাই করুন। কোন অবস্থাতেই আনফিট গাড়ি দিয়ে যাত্রা শুরু করবেন না। আর গাড়ি চালানোর সময় অনুগ্রহ করে মোবাইল ফোনে কথা বলবেন না। যদি একান্তই প্রয়োজন হয়, তবে গাড়িটাকে পাচঁ মিনিটের জন্য থামান এবং প্রয়োজনীয় কথা বলে নিন। এছাড়া ও চলন্ত অবস্থায় গান শুনবেন না। কারন এক্ষেত্রে আপনার মন চালকের আসন থেকে অন্য দিকে চলে যেতে পারে এবং ঘটে যেতে পারে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। সুতরাং আপনি ঠান্ডা মাথায় এবং একাগ্রচিত্তে গাড়ি চালান । কোন অবস্থাতেই আপনি অসুস্থ শরীর নিয়ে গাড়ি চালাবেন না। কারন এতে সঠিকভাবে গাড়ি চালাতে পারবেন না। আগে আপনি শারীরিক এবং মানসিক ভাবে সুস্থ হউন, তারপর গাড়ি চালান। কারন অসুস্থ অবস্থায় কারো পক্ষে সঠিকভাবে কোন কাজ করা সম্ভব হয় না । এটা হচ্ছে একটা বাস্তবতা। কিছু কিছু যাত্রী আছে, যারা অধিকতর গতিতে গাড়ি চালানোর জন্য চালককে নির্দেশ দেয় এবং উৎসাহিত করে। এসব যাত্রী ভাইদের প্রতি অনুরোধ, অনুগ্রহ করে জোরে গাড়ি চালানোর জন্য চালককে উৎসাহিত করবেন না। কারন জোরে গাড়ি চালিয়ে একটু আগে পৌছার চেয়ে নিরাপদে পৌছাটাই জরুরী। পাশাপাশি সকল ধরনের যানবাহন মালিকদের প্রতি অনুরোধ, আপনারা অনুগ্রহ করে আপনার গাড়িটির দায়িত্ব একজন অদক্ষ এবং দায়িত্বহীন চালকের হাতে তুলে দিবেন না। এতে আপনার জীবনও বিপদগ্রস্ত হতে পারে। চালকের ভুলে গাড়ির মালিকের জীবনহানির নজীর ও কিন্তু অনেক আছে। আর অত্যধিক মুনাফার আশায় অনুগ্রহ করে পুরাতন এবং লক্ষর জক্ষর মার্কা যানবাহন সমুহ রাস্তায় নামাবেন না। মনে রাখবেন, সাবধানের কোন মাইর নাই । আর সময়ের চেয়ে জীবনের মুল্য অনেক বেশী ।
এ অবস্থায় এসব র্দুঘটনা রোধে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে আরম্ভ করে বেসরকারী পর্যায়ে, সামাজিক পর্যায় থেকে আরম্ভ করে ব্যক্তিগত পর্যায়ে অর্থাৎ প্রত্যেককে তার নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করতে হবে এবং সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। সড়ক র্দুঘটনা রোধে সরকারকে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে এবং ওভারটেক নিষিদ্ধ করতে হবে। কোন ধরনের অদক্ষ এবং অনভিজ্ঞ ড্রাইভারকে গাড়ি চালাতে দেয়া যাবে না। বিআরটিএ কে কঠোর আইন প্রনয়নের আহবান জানাচ্ছি। একই ভাবে সেই আইনের মনিটরিং বাড়ানোর জন্য আবেদন জানাচ্ছি। যে সব গাড়ি দুর্ঘটনায় কবলিত হয়েছে এবং তাতে প্রানহানি হয়েছে, সেসব গাড়ির চালক এবং মালিক উভয়কেই বিচারের আওতায় আনতে হবে এবং দায়ী হলে শাস্তি দিতে হবে। ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া কোন ড্রাইভার যেন গাড়ি চালাতে না পারে তার জন্য আইন প্রনয়ন করতে হবে। মদ পান করে এবং ঘুম ঘুম চোখে গাড়ি চালানো যাবে না। উপযুক্ত ফিটনেস ছাড়া কোন গাড়িকে চলাচলের অনুমতি দেয়া যাবে না। এক্ষেত্রে কেউ যদি আইন অমান্য করে এবং ফিটনেস বিহীন গাড়ি চালায় তবে তার জন্য যানবাহনের মালিকদেরকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমুলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। দেশের সবগুলি সড়ককে কমপক্ষে দুই লেন বিশিষ্ট করতে হবে। যেন তেন ভাবে ওভারটেক করার মানসিকতা পরিহার করতেই হবে। ট্রাফিক সিস্টেমকে আরো উন্নত, আধুনিকায়ন এবং কার্যকর করতে হবে। যত্র তত্র রাস্তা পার হওয়া যাবে না। গাড়িতে ওঠলেই আমরা কেবল আগে যেতে চাই। এই মানসিকতা পরিহার করতে হবে। কারন গন্তব্য স্থানে কিছু সময় আগে পৌছা মানে জীবনের অবধারিত উন্নতি নয়।আবার গন্তব্য স্থানে কিছুটা সময় দেরিতে পৌছা মানে জীবনের অবধারিত পরাজয় নয়। সুতরাং সাবধানে গাড়ি চালান এবং নিরাপদে বাড়ি ফিরুন। সড়ক দুর্ঘুটনার জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে যানবাহনের চালকই দায়ী। সড়ক র্দুঘটনা রোধে ব্যবস্থা গ্রহনের পাশাপাশি ব্যক্তি জীবনে র্দুঘটনা রোধের জন্য ও আমাদের সবাইকে দায়িত্বশীল এবং সচেতন হতে হবে। আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্টা করতে হবে। ব্যর্থতার কারনে আত্মহত্যা কোন সমাধান নয়। তা নিজেকে চিরতরে ধ্বংস করার সহজ প্রক্রিয়া। তাই আবেগের বশিভুত হয়ে নয় বরং বিবেকের দ্বারা জীবনকে পরিচালনা করতে হবে। দু:খ কষ্ট থেকে মুক্তির জন্য আত্মহনন নয় বরং দু:খ কষ্টকে সহ্য করে সু:খকে ছিনিয়ে আনার জন্য কাজ করতে হবে। আমাদের সবার সম্মিলিত সহযোগিতায় সড়ক র্দুঘটনা সহ সকল প্রকার দুর্ঘটনা বন্ধ হউক এবং সবার জীবনে সুখ আসুক — এটাই প্রার্থনা ।
লেখক : প্রকৌশলী এবং উন্নয়ন গবেষক ।
খুলনাটুডে.কম | খুলনা বিভাগের সকল সংবাদ সবার আগে