খুলনা, বাংলাদেশ | ৩রা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ১৬ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৭শে শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

Warning: Attempt to read property "post_excerpt" on null in /home/khulnatoday/public_html/wp-content/themes/sahifa/framework/parts/post-head.php on line 73

চীন-ভারতের দ্বন্ধে বাংলাদেশ যেন পিষ্ঠ না হয়

জালাল উদ্দিন ওমর:

আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম  দেশ। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে  আমরা অর্জন করেছি  কাঙ্খিত এই স্বাধীনতা। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে আমরা অর্জন করেছি একটি স্বাধীন পতাকা । আয়তনে ছোট হলেও বাংলাদেশ পৃথিবীর বুকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন দেশ। এদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতির দেশ। স্বাভাবিক ভাবেই এদেশে রয়েছে  ভোগ্য পণ্য সহ নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের  বিশাল এক বাজার । ভৌগলিক ভাবে কৌশলগত অবস্থান বাংলাদেশকে করেছে আরো বেশী গুরুত্বপূর্ন। প্রাকৃতিক এবং পরিবেশগত ভাবে এদেশের ভুমি কৃষিকাজের জন্য খুবই উপযোগী। অসংখ্য নদ-নদী এবং হাওর-লেকে সমৃদ্ধ এই বাংলাদেশ মৎস্য সম্পদের বিরাট এক আঁধার। বাংলাদেশের বিশাল উপকুল জুড়ে বঙ্গোপসাগরের অবস্থান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক গুরুত্বকে বহুগুন বাড়িয়ে দিয়েছে। র্কণফুলী নদী এবং বঙ্গোপসাগরের মোহনায় অবস্থিত চট্রগ্রাম বন্দর অর্থনৈতিক উন্নয়নের অবারিত এক সুযোগ সৃষ্টি করে চলেছে। বাংলাদেশের সামনে রয়েছে ব্লু ইকোনমিতে এগিয়ে যাবার বিরাট এক হাতছানি। এদেশের মাটির নীচে লুকিয়ে আছে তেল,গ্যাস এবং কয়লা সহ অতি প্রয়োজনীয় এবং মুল্যবান খনিজ পদার্থের বিশাল এক সমাহার। প্রকৃতির দান সুন্দরবন বাংলাদেশকে বিশ্ব মানচিত্রে আলাদা একটি পরিচিতি দান করেছে। কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকত সহ অসংখ্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সম্বলিত স্থান এদেশের পর্যটন খাতকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ করেছে। সব মিলিয়ে  আমার প্রিয় বাংলাদেশ যেন অফুরন্ত সম্ভাবনার এক জনপদ। এই সম্ভাবনাকে যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে আমরা এগিয়ে যেতে চাই আরো বহুদুর ।

বাংলাদেশের  নিকটতম এবং বৃহত্তম প্রতিবেশী হচ্ছে ভারত। বাংলাদেশের তিন দিকেই ভারতের অবস্থান । বাংলাদেশের সাথে ভারতের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে । আয়তন, জনসংখ্যা, সামরিক বাহিনী সব দিক দিকেই ভারত একটি বৃহত দেশ । পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম জনসংখ্যা ভারতে বসবাস করে এবং এর পরিমাণ প্রায় একশত দশ কোটি । ভারতের হাতে রয়েছে পারমানবিক অস্ত্র । ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত বাংলাদেশকে সাহায্য করেছে । আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক বরাবরই ভাল থাকে, এখনো আছে । ভারত তার সেভেন সিস্টার্স  নামে পরিচিত রাজ্য সমুহে মালামাল পরিবহনের জন্য বাংলাদেশের ভুখন্ডকে করিডোর হিসাবে ব্যবহার  করছে । চট্রগ্রাম বন্দর ব্যবহরের জন্য ভারত অনুমতি পেয়েছে । বাংলাদেশ কয়েক বছর থেকেই ভারত হতে বিদ্যুত আমদানি করছে । এখন সুন্দরবনের রামপালে ভারত যৌথ উদ্যোগে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করছে । বাংলাদেশে ভারতীয় পন্যের বিশাল এক বাজার সৃষ্টি হয়েছে । বাংলাদেশ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা যেমন নিয়মিত ভাবে ভারত সফর করছেন, ঠিক তেমনি ভারত সরকারের উচচ পর্যায়ের কর্মকর্তারা ও নিয়মিতভাবে বাংলাদেশ সফর করছেন । উভয় দেশের সরকার প্রধানই ইতিমধ্যে একে অন্যের দেশ সফর করেছেন । উভয় দেশের নেতারাই ভারত বাংলাদেশের সম্পর্ককে উচ্চ মাত্রার বলে অভিহিত করেছেন । কিন্তু ভারত কর্তৃক সীমান্ত হত্যা এখনো বন্ধ হয়নি এবং তিস্তার পানি বন্টন নিয়ে ভারত এখনো কোন চুক্তি করেনি । আমরা আশা করবো, বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসাবে ভারত সীমান্ত হত্যা বন্ধ করবেন এবং তিস্তার পানি বন্টন নিয়ে সহসাই একটি চুক্তি সম্পন্ন করবেন । আর এর মাধ্যমে ভারত বাংলাদেশের সম্পর্ক আরো এগিয়ে যাবে ।

ভারতের মতই চীন বাংলাদেশের আরেকটি প্রতিবেশী দেশ । তবে চীনের সাথে সরাসরি বাংলাদেশের কোন সীমান্ত নেই । চীন এবং বাংলাদেশের মাঝখানে ভারতের সেভেন সিস্টার্স নামে পরিচিত রাজ্যগুলো অবস্থিত । আয়তন, জনসংখ্যা এবং সামরিক বাহিনীর দিক দিয়ে চীন বিশাল একটি দেশ । চীনের জনসংখ্যা সবচেয়ে বেশী এবং সেখানে  বসবাস করে প্রায় একশত ত্রিশ কোটি মানুষ । ভারতের মত চীন ও পারমানবিক অস্ত্রে সমৃদ্ধ একটি দেশ । চীন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য এবং ভেটো ক্ষমতার অধিকারী দেশ । চীনের অর্থনীতি এখন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এবং বিকাশমান অর্থনীতি । চীনের উৎপাদিত পন্য সারা পৃথিবীর বাজার দখল করেছে । রপ্তানীর ক্ষেত্রে চীনের অবস্থান এখন পৃথিবীর শীর্ষে । পাশাপাশি বিশ্ব  রাজনীতিতে চীন এক গুরুত্বপূর্ন ভুমিকা পালন করে চলেছে ।স্বাভাবিক ভাবেই চীনের মত একটি শক্তিশালী দেশের বন্ধুত্ব এবং সহযোগিতা যে কোন দেশের শান্তি, স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন এবং নিরাপত্তার জন্য যেমন অত্যন্ত সহায়ক, ঠিক তেমনি ভাবে তার শত্রুতা এবং অসহযোগিতা যে কোন দেশের শান্তি, স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন এবং নিরাপত্তার জন্য বিরাট এক হুমকি । বাংলাদেশের সাথে চীনের বরাবরই একটি ভাল সম্পর্ক বিরাজমান । বাংলাদেশ এবং চীনের নেতারা নিয়মিত ভাবে একে অন্যের দেশ সফর করছেন এবং উভয় দেশের নেতারাই তাদের মধ্যকার সম্পর্ককে আরো উন্নত করার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন । অতীতে বাংলাদেশের অনেক বড় বড় প্রকল্প চীনের সহায়তায় নির্মিত হয়েছে । চীন বর্তমানে চট্রগ্রামের কর্নফুলীর নদীর নীচ দিয়ে টানেল তৈরীর কাজ করছে  এবং চট্রগ্রামের  আনোয়ারায়  চীন নির্মাণ করছে চায়না অর্থনৈতিক  জোন । আমরা আশা করবো অতীতের মত বাংলাদেশের উন্নয়নে চীন আরো বেশি সহায়তা করবে এবং এর মাধ্যমে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে ।

বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের অনুন্নত এবং ক্ষুদ্র একটি দেশ । তবে কৌশলগত কারনে  আর্ন্তজাতিক পরিমন্ডলে বাংলাদেশের অনেক গুরুত্ব রয়েছে । বাংলাদেশের তিনদিকেই ভারত, যা বর্তমান বিশ্বের আরেকটি উদিয়মান পরাশক্তি । ভারতের সাথে বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের সম্পর্ক  অনেক বেশী বন্ধু ভাবাপন্ন । আবার  আরেক পরাশক্তি চীনের সাথে ও বাংলাদেশের ভাল সম্পর্ক । কিন্তু চীন এবং ভারত পরস্পর শত্রু ভাবাপন্ন ।  সীমান্ত সমস্যা, তিব্বত সমস্যা এবং শক্তির প্রতিযোগিতার কারনে ভারত এবং চীন পরস্পর শত্রু ভাবাপন্ন এবং তাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই বিরাজ করছে বৈরী একটি সম্পর্ক । এক কথায় দীর্ঘদিন থেকেই চীনের সাথে ভারতের অঘোষিত একটি যুদ্ধ চলছে । আবার বাংলাদেশের প্রতিবেশী মিয়ানমারের সাথে ও চীনের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব । আবার ভারতের চিরশত্রু পাকিস্তান হচ্ছে চীনের পরম বন্ধু । ফলে ভারত এবং চীনের সাথে সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সতর্ক পন্থা অবলম্বন করতে হবে । ভারতের সাথে বাংলাদেশের বেশী বন্ধুত্ব  চীনের কাছে যেমন অপছন্দ, ঠিক তেমনিভাবে চীনের সাথে বেশী বন্ধুত্ব  ভারতের কাছে অপছন্দ ।  একইভাবে ভারতের সাথে বাংলাদেশের বৈরিতা চীনের কাছে যেমন পছন্দ,  ঠিক তেমনি ভাবে চীনের সাথে বাংলাদেশের বৈরীতা ভারতের কাছে পছন্দ। আবার চীনের সাথে বেশি ঘনিষ্ঠতায় সময়ের সেরা পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র নাখোশ হয় । কথাগুলো অবিশ্বাস্য এবং অতিরঞ্জিত মনে হলে ও এটাই কিন্তু সত্য এবং বাস্তবতা । কারন শত্রুর শত্রু বন্ধু এবং শত্রুর বন্ধু শত্রু । একইভাবে বন্ধুর বন্ধু বন্ধু এবং বন্ধুর শত্রু শত্রু । বর্তমান বিশ্বের রাষ্ট্রসমুহের মধ্যে রাজনৈতিক, কুটনৈতিক,  অর্থনৈতিক এবং সামরিক ক্ষেত্রে যে ঐক্য এবং দুরত্ব, তার মাপকাঠি কিন্তু এটাই এবং এটার ভিত্তিতেই সম্পর্ক, মেরুকরন এবং বিভাজন চলছে । মুলতপক্ষেই এই নিয়মেই আর্ন্তজাতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এখানে আদর্শ কোন ফ্যাক্টার নয় । যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু বলেই চীন,  রাশিয়া,  ভেনিজুয়েলা,  উত্তর কোরিয়া সাথে ইরানের ভাল  সম্পর্ক । একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু বলেই সিরিয়ার সাথে চীন, রাশিয়া এবং ইরানের ভাল সম্পর্ক। একই সাথে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলে প্রধান শত্রু বলেই হামাস এবং হিজবুললাহর সাথে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাসার আল আসাদের ভাল সম্পর্ক। একইভাবে চীন এবং মায়ানমার উভয়েই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বৈরী ভাবাপন্ন বিধায়, তাদের মধ্যে রয়েছে মিত্রতা । একই ভাবে ভারতের শত্রু হওয়ায় পাকিন্তান হয়েছে চীনের মিত্র । বাংলাদেশের সাথে বহি:বিশ্বের সম্পর্ক এই বাস্তবতার  বাইরে নয় ।  সুতরাং বৃহৎ এবং পরস্পর বৈরী ভাবাপন্ন দুই রাষ্ট্র চীন এবং ভারতের সাথে সম্পর্ক প্রতিষ্টার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সাবধানে পথ চলতে হবে । কোন ধরনের আবেগ নয় বরং বাস্তবতার  ভিত্তিতে প্রত্যেক রাষ্ট্রকে সম্মান করতে হবে এবং তাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ন সম্পর্ক প্রতিষ্টা করতে হবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশকে তার অবস্থান ঠিক রাখতে হবে এবং স্বকীয়তা বজায় রাখতে হবে। অপরের স্বাধীনতা-স্বার্বভৌমত্বের প্রতি যেমন সম্মান প্রদর্শন করতে হবে, ঠিক তেমনি নিজের স্বাধীনতা স্বার্বভৌমত্বকে ও সুরক্ষিত করতে হবে । নিজের অবস্থানকে অক্ষুন্ন এবং সুদৃঢ় করে তবেই ভারত এবং চীনের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করতে হবে । নিজের স্বকীয়তাকে কখনো বিসর্জন দেয়া যাবে না । এক্ষেত্রে ব্যালেন্স অব পাওয়ার এবং ব্যালেন্স অব রিলেশান বজায় রাখতে হবে এবং কারো বিরাগভাজন হওয়া যাবে না । বৃহৎ  শক্তিকে কৌশলেই  হ্যান্ডেল করতে হবে এবং সাবধানে  অগ্রসর হতে হবে । আমরা চাই সবার সাথে বন্ধুত্ব এবং সহযোগিতা ।

পরিশেষে যে কথাটি বলতে চাই, তা হচ্ছে ভারত এবং চীন উভয় রাষ্ট্রের সাথেই আমাদের বন্ধুত্ব  রক্ষা করতে হবে । এবং সেটা সম্ভব। একই সাথে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, বৃটেন, ফ্রান্স সহ সকল পরাশক্তির সাথে ও সুসম্পর্ক  রক্ষা করতে হবে । যদি আমরা আমাদের  স্বকীয়তাকে অক্ষুন্ন রাখি এবং এরপর  যুক্তি তর্কের সাথে সামনে অগ্রসর হই তাহলে সেটা অবশ্যই সম্ভব। আমরা যদি আমাদের ন্যায্য অধিকারের কথা বলি এবং একই সাথে অপরের ন্যায্য অধিকারকে সম্মান করি, তাহলে সম্পর্ক সঠিক পথে থাকবে । আর সেই সম্পর্কের ভিত্তি করেই বাংলাদেশকে এগিয়ে যেতে হবে । যদি সেই সম্পর্কের ব্যালেন্স নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে বাংলাদেশই ক্ষতিগ্রস্থ হবে । কোন অবস্থাতেই বাংলাদেশ যেন ভারত এবং চীনের মধ্যকার দ্বন্ধের বলি নয় । চীন–ভারতের দ্বন্ধে বাংলাদেশ যেন পিষ্ঠ না হয় । কারো সাথে বেশি বন্ধুত্ব ও করা যাবে না । আবার কারো বিরাগভাজন ও হওয়া যাব না। আমরা আশা করবো সরকার এ ক্ষেত্রে দুর দর্শিতার পরিচয়  দিবেন এবং ভারত এবং চীন উভয়ের সাথেই সুসম্পর্ক বজায় রাখবেন । বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভারতীয় এবং চীনা ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ অনেক বেশি প্রয়োজন । বাংলাদেশ তার স্বাধীনতা, সাবভৌমত্ব এবং নিজস্ব স্বার্থ ও স্বকীয়তাকে অক্ষুন্ন রেখে ভারত এবং চীনের সাথে ভাল সম্পর্ক বজায় রাবে এবং ভারত ও চীনের কারিগরি, প্রযুক্তিগত এবং বানিজ্যিক সহযোগিতায় বাংলাদেশ শান্তি, উন্নয়ন এবং সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাবে,  এটাই আমাদের প্রত্যাশা ।

লেখক : প্রকৌশলী এবং উন্নয়ন গবেষক ।