জালাল উদ্দিন ওমর:
খোদ ভারতেই এবার ফারাক্কা বাঁধের বিরুদ্ধে কথা উঠেছে। ব্যাপারটা অবাক করার মত হলেও শতভাগ সত্যি। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে সাক্ষাত করে ফারাক্কা বাধঁ স্থায়ী ভাবে ভেঙ্গে দেয়ার দাবী জানিয়েছেন এবং এখনি ফারাক্কা বাঁধের সব গেইট খুলে দেয়ার দাবী জানায় । তিনি বিহারের বন্যা পরিস্থিতির জন্য সরাসরি ফারাক্কা বাধঁকে দায়ী করেন। বিহারের মুখ্যমন্ত্রীর দাবীর প্রেক্ষিতে ভারত সরকার ইতিমধ্যেই ফারাক্কা বাধেঁর অধিকাংশ গেইট খুলে দিয়েছে। মোট ১০৪টি গেইটের মধ্যে ৯৫ টি গেইটই খুলে দিয়েছে বলে খবরে প্রকাশ। নরেন্দ্র মোদির সাথে সাক্ষাত করে নীতিশ কুমারের ফারাক্কা বাধঁ স্থায়ী ভাবে ভেঙ্গে দেয়া এবং এখনই ফারাক্কা বাধেঁর সব গেইট খুলে দেয়ার দাবী মুহুর্তেই মিডিয়া জগতে ছড়িয়ে পড়ে। এ খবর বাংলাদেশের জনগনের মুখে মুখে আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিনত হয়। কারন বাংলাদেশের জনগনের বিরাট একটি অংশ দীর্ঘদিন থেকে ভারত কর্তৃক গঙ্গা নদীর ওপর ফারাক্কা বাধঁ নির্মাণকে বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর বললেও, অপর অংশ এই অভিযোগকে কখনই গুরত্ব দেয়নি। বরং ফারাক্কা বাধেঁর বিরোধীতাকে ভারত বিরোধীতা হিসাবে অভিহিত করা হয়েছে। কিন্তু ফারাক্কা বাঁধ চালুর বিয়াল্লিশ বছর পর আজ স্বয়ং ভারতের রাজনীতিবিদরা যখন ফারাক্কা বাধঁ ভেঙ্গে দেয়া এবং এর গেইটগুলো খুলে দেয়ার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে দাবী জানায় এবং সেই দাবী অনুযায়ী সাথে সাথে ভারত সরকার যখন ফারাক্কা বাধেঁর গেইটগুলো খুলে দেয়, তখন ফারাক্কা বাধঁ যে একটি ক্ষতিকর প্রকল্প তা বুঝতে আর কারো বাকী থাকার কথা নয়। এর মাধ্যমে ফারাক্কা বাধেঁর অপ্রয়োজনীয়তা সন্দেহাতীত ভাবে প্রমানিত হয়েছে। মুলতপক্ষে এই ফারাক্কা বাধঁ ভারত এবং বাংলাদেশ কারো জন্যই কোন লাভজনক প্রজেক্ট নয়। ফারাক্কা বাধেঁর কারনে এতদ অঞ্চল এতদিন কেবল ক্ষতিগ্রস্তই হয়েছে। এই বাধেঁর কারনে বাংলাদেশ যেমন ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, ঠিক তেমনি ভারতও ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। আর দীর্ঘদিন যাবত যারা ফারাক্কা বাধেঁর বিরোধীতা করেছিল আজ তাদের দাবীর সত্যতা প্রমানিত হয়েছে। একইভাবে ফারাক্কা বাধেঁর বিরোধীতাকে যারা ভারত বিরোধীতা বলে অভিহিত করেছিল, তাদের সেই অভিযোগ মিথ্যা প্রমানিত হয়েছে। আজ ফারাক্কা বাধেঁর বিরোধতা করার জন্য আর বাংলাদেশের জনগনের প্রয়োজন নেই। আর ফারাক্কা বাধেঁর পক্ষে কথা বলার মত কোন যুক্তিও এর স্বপক্ষের লোকদের নেই। সুতরাং এখন উচিত ভারত বাংলাদেশের যৌথ কল্যানের স্বার্থে ফারাক্কা বাধঁকে স্থায়ী ভাবে ভেঙ্গে ফেলা । এটাই বাস্তবতা এবং এতেই উভয় দেশের কল্যান নিহিত রয়েছে ।
কলকাতা বন্দর ছিল, বৃটিশ ভারতের সবচেয়ে বড় বন্দর। হুগলি নদী থেকে বয়ে আসা বিপুল পরিমান পলি বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে ব্যাহত করে। নাব্যতা বজায় রাখতে গঙ্গা নদীতে ব্যারাজ নির্মান করে বিকল্প খাল দিয়ে গঙ্গার পানিকে হুগলি নদীতে প্রবাহিত করা শুরু হয়। ভারত সরকার ১৯৫১ সালে ফারাক্কা বাধঁ নির্মানের জন্য পরিকল্পনা গ্রহন করে। ১৯৬১ সালে নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং ১৯৭৪ সালে এসে এর নির্মাণ কাজ শেষ হয় । ১৯৭৪ সালে ফারাক্কা বাঁধ পরীক্ষামুলক ভাবে চালু করা হয়। ফারাক্কা বাধেঁর কারনে গঙ্গার স্বাভাবিক পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রিত হয়ে যায়। ফারাক্কা বাধঁ চালুর পর থেকেই এই বাধেঁর উজান এবং ভাঁটিতে অবস্থিত অঞ্চলে পরিবেশ গত বিপর্যয় শুরু হয়। এই বাধেঁর উজানে বির্স্তীন এলাকায় পলি জমার কারনে প্রতি বছর বন্যা হয় আর ভাটির অঞ্চলে পানির অভাবে খরা হয়। পশ্চিম বঙ্গের মালদহ এবং মুর্শিদাবাদ জেলায় ব্যাপক নদীভাঙ্গন হয় এবং বিশাল জনগোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্থ হয়। বিহার প্রদেশে প্রতি বছরই ব্যাপক বন্যা হয়। বছরের পর বছর ধরেই এ অবস্থা চলে আসছে । আর ভাটিতে অবস্থিত বাংলাদেশের রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ন এলাকা জুড়ে পানির অভাবে পরিবেশ গত বির্পযয় সৃষ্টি হয়। শুস্ক মৌসুমে ফারাক্কা বাধের মাধ্যমে ভারত পানি নিয়ন্ত্রন করার কারনে পদ্মা নদীর বুকে চর আর চর জেগে ওঠে। অপরদিকে বর্ষা মৌসুমে পানি ছেড়ে দেবার কারনে সেই পানিতে বাংলাদেশের বির্স্তীন অঞ্চলে বন্যা হয়। ১৯৯৬ সালে গঙ্গার পানি বন্টন নিয়ে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী দেবগৌড়ার সাথে বাংলাদেশের তৎকালীন ও আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও, ভারত কখনোই চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশকে পানি দেয়নি। ফলে ফারাক্কা বাঁধ বাংলাদেশের জন্য আজ মহা এক অভিশাপ হয়ে দেখা দিয়েছে। শুস্ক মৌসুমে বাংলাদেশ পর্যাপ্ত পানি না পাবার কারনে ক্ষতিগ্রস্থ হয় প্রকৃতি, পরিবেশ, নদী প্রবাহ, নৌ-যোগাযোগ, কৃষি, মৎস্য, অর্থনীতি এবং মানব বসতি। হাজার হাজার হেক্টর জমিতে ফসল হচ্ছে না। ফলে কৃষকেরা সর্বশান্ত। বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চল জুড়ে মরুপ্রক্রিয়া চলছে। এদিকে নদীতে পানি শুকিয়ে যাবার ফলে নদী তীরবর্তী বিস্তীর্ন এলাকায় ভুগর্ভস্ত পানির স্তর ক্রমেই নিচে নেমে যায়। ফলে নলকুপে পানি ওঠে না। পানির অভাবে রাজশাহীর বরেন্দ্র সেচ প্রকল্প আজ ধ্বংসের মুখোমুখি। এ পর্যন্ত শুধুমাত্র ফসল উৎপাদন ব্যাহত হবার ফলে অর্থনীতিতে ক্ষতির পরিমান প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশ–ভারতের মাঝে ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে । যে গুলোর উৎপত্তি ভারতে এবং ভারত হয়ে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়েছে। এই নদীসমুহের পানির ওপর ভারতের মত বাংলাদেশের ও আইন সংগত এবং ন্যায্য অধিকার রয়েছে। তাই ভারতের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে বলেই ভারত কিন্তু তার প্রয়োজন অনুসারে এবং ইচ্ছামত নদীর পানিকে নিয়ন্ত্রন করতে পারে না। এটা অভিন্ন নদীর পানি প্রবাহ বন্টনের জন্য আর্ন্তজাতিক যে আইন কানুন এবং নিয়ম নীতি রয়েছে তার সুস্পষ্ট লংগন। অভিন্ন নদীর পানি ব্যবহারের জন্য আর্ন্তজাতিক অনেক নীতিমালা রয়েছে। তার দুটি এখানে উল্লেখ করছি। হেলসিংকি রুল ১৯৬৬ এ বলা হয়েছে “অভিন্ন নদী বয়ে চলা প্রতিটি দেশকে নদীর পানি এমনভাবে ব্যবহার করতে হবে, যাতে তা অন্য কোন দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশকে বিঘ্নিত না করে। এবং তা ক্ষতিগ্রস্ত দেশে কি ক্ষতি বয়ে আনবে তা বিবেচনায় আনতে হবে ” ১৯৯৭ সালের ২১শে মে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে গৃহিত ইউএন কনভেনশনের ৫নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে-” সর্বোচ্চ টেকসই ব্যবহারও উপকারের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে পানিপ্রবাহ পর্যাপ্ত সংরক্ষণ নিশ্চিত করে অভিন্ন নদীপ্রবাহের দেশগুলো ন্যায্যও যৌক্তিক উপায়ে পানি ব্যবহার করবে।এতে আরো বলা হয়েছে–পানি প্রবাহের দেশগুলো আর্ন্তজাতিক পানি প্রবাহ ব্যবহার, উন্নয়ন ও সংরক্ষনের কাজে ন্যায্যও যৌক্তিকতার ভিত্তিতে অংশ নেবে।” অথচ ভারত সরকার ইচ্ছামত অভিন্ন নদীর পানিকে ব্যবহার করছে। ভারত সরকার কর্র্তৃক ফারাক্কা বাধঁ নির্মাণ এবং এই বাধেঁর মাধ্যমে অভিন্ন নদীর পানি নিয়ন্ত্রন আর্ন্তজাতিক এসব নীতিমালার সুস্পষ্ঠ লংঘন। ফারাক্কা বাধঁ নির্মাণের পর থেকেই আজ অবধি বাংলাদেশের জনগনের বিরাট একটি অংশ এই ফারাক্কা বাধেঁর বিরুদ্ধে কথা বলেছে এবং আন্দোলন করেছে। তারা ফারাক্কা বাধঁকে বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর অভিহিত করে এই বাধঁকে চিরতরে ভেঙ্গে দেয়ার দাবী জানিয়েছে। মরহুম জননেতা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এই ফারাক্কা বাধেঁর বিরুদ্ধে লংমার্চ করেছিল। ১৯৭৬ সালের ১৬ই মে মওলানা ভাসানী এই ফারাক্কা লং মার্চ করেছিল। আজ সেই লং মার্চের চল্লিশ বছর পর এসে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী জনাব নীতিশ কুমার যখন কেন্দ্রীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব নরেন্দ্র মোদির সাথে সাক্ষাত করে বিহারের বন্যার জন্য ফারাক্কা বাঁধকে দায়ী করে ফারাক্কা বাধেঁর গেইটগুলো খুলে দেয়ার দাবী তোলে এবং নীতিশ কুমারের বক্তব্যের সাথে কোন ধরনের দ্বিমত পোষন না করে ভারত সরকার যখন ফারাক্কার বাধেঁর গেইট গুলো খুলে দেয়, তখনই ফারাক্কা বাধেঁর অপ্রয়োজনীয়তা প্রমানিত হয়ে গেছে। মজার বিষয় হচ্ছে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমারের ফারাক্কা বাধঁ বিরোধী কর্মসুচির কেউ সমালোচনা করেনি। সুতরাং ফারাক্কা বাধেঁর বিরুদ্ধে বাংলাদেশী জনগনের আন্দোলনের যৌক্তিকতা এবং অপরিহার্যতা আজ প্রমানিত হল ।
এই মহাবিশ্বের কোন কিছুই মানুষের হাতে সৃষ্ট নয়। মানুষের বসবাসের এই পৃথিবীটা ও মানুষের হাতে সৃষ্ট নয় । সুর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র, আকাশ, বাতাস, অক্সিজেন, আলো, পানি-কোনটাই মানুষের হাতে সৃষ্ট নয়।একইভাবে এই পৃথিবীতে মানুষের জীবন ধারনের জন্য প্রয়োজনীয় হাজারো উপকরনের কোনটাই মানুষের হাতে সৃষ্ট নয়। ভুখন্ডে বসবাসরত হাজারো প্রানী, আকাশে উড়ে বেড়োনো হাজারো পাখি আর পানিতে বসবাসরত হাজারো মাছের কোনটাই মানুষের হাতে সৃষ্ট নয়। একইভাবে ভুখন্ডের মাটি ভেদ করে আকাশের দিকে মাথা উচু করে দাড়িয়ে থাকা হাজারো গাছ পালার কোনটই মানুষের হাতে সৃষ্ট নয়। একইভাবে এই পৃথিবীতে বিদ্যমান হাজারো পাহাড়-পর্বত, নদ-নদী এবং সাগর-মহাসাগরের কোনটাই মানুষের হাতে সৃষ্ট নয়। হিমালয় কিংবা আল্পস পর্বতের চুড়া আর প্রশান্ত কিংবা আটলান্টিক মহাসাগরের অথৈই জলরাশির কোনটাই মানুষের হাতে সৃষ্ট নয়। আবার পাহাড় পর্বত সমুহের অবস্থান, নদ-নদী সমুহের উৎপত্তি, এর গতি প্রকৃতি এবং সাগর মহাসাগরের সীমা পরিসীমার কোনটাই মানুষের হাতে সৃষ্ট নয়। আবার এসবের জন্ম কখন, কেন এবং কিভাবে হল এবং এসবের ভবিষ্যত পরিনতিই বা কি তাও মানুষ জানে না। কারন এসবই স্রষ্টার সৃষ্টি এবং তিনি এসবের নিয়ন্ত্রণকর্তা। মানুষ স্বীকার করুক আর নাই করুক এটাই সত্য এবং এটাই বাস্তবতা। তাই স্রষ্টার হাতের সৃষ্ট কোন নদীর গতিপথকে যদি মানুষেরা গায়ের জোড়ে বদলাতে চায়, তাহলে তাতে মানুষের জন্য কোন কল্যান নেই বরং অকল্যানই নিহিত আছে। কারন মানুষের কল্যাণের জন্যই তো স্রষ্টা একেক নদীর একেক গতিপথ সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং মানুষ যদি অজ্ঞতা এবং অহংকার বশত কোন নদীর গতিপথের স্বাভাবিক প্রবাহে বাধঁ নির্মাণ করে এবং সেই বাধেঁর মাধ্যমে পানিকে নিয়ন্ত্রন করে, তাহলে তা মানুষের জীবনে কল্যানের পরিবর্তে অকল্যানই বয়ে আনে। ফারাক্কা বাধঁ নির্মাণের বিয়াল্লিশ বছর পর আজ যখন ভারতেরই একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ফারাক্কা বাধঁকে অকল্যানকর আখ্যায়িত করে এর গেইট সমুহ খুলে দেয়ার দাবী জানায় এবং সেই দাবীর সাথে একমত হয়ে ভারত সরকার যখন সাথে সাথেই ফারাক্কা বাধেঁর গেইটসমুহ খুলে দেয়, তখন স্রষ্টার সৃষ্ট গঙ্গা নদীতে মানুষের সৃষ্ট বাধঁ যে ক্ষতিকর তা সন্দেহাতীত ভাবে প্রমানিত হয়। সুতরাং আসুন স্রষ্টার সৃষ্ট এই পৃথিবীর নদ নদী সমুহকে স্বাভাবিক ভাবে প্রবাহিত হতে দিই। আর ভারত বাংলাদেশের কল্যানের স্বার্থেই ফারাক্কা বাধঁকে চিরতরে ভেঙ্গে দিই এবং অন্য নদীর ওপর নতুন কোন বাধঁ নির্মাণ হতে বিরত হই। কারন নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ সাগরে মিলনের মধ্যেই কল্যাণ, অন্য কোথাও নয় ।
লেখক: প্রকৌশলী ও উন্নয়নকর্মী ।
খুলনাটুডে.কম | খুলনা বিভাগের সকল সংবাদ সবার আগে